ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচি ২০২৬: ১০ মার্চ উদ্বোধন, দরিদ্র পরিবার পাবে মাসে ২,৫০০ টাকা
ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচি ২০২৬: ১০ মার্চ উদ্বোধন, দরিদ্র পরিবার পাবে মাসে ২,৫০০ টাকা
ঢাকা | নিজস্ব প্রতিবেদক
নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে “ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬”। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত দরিদ্র পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ মার্চ ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গেই সুবিধাভোগী পরিবারের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রথম মাসের অর্থ পৌঁছে যাবে।
পরিবার হবে উন্নয়নের মূল একক
গাইডলাইনে বলা হয়েছে, এই কর্মসূচির মূল দর্শন হলো—
“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।”
বর্তমানে দেশে প্রায় ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পাওয়া (Double-dipping) এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
নতুন ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা এসব সমস্যা দূর করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে বলে আশা করছে সরকার।
কার্ড হবে নারীর নামে
এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন।
ফ্যামিলি কার্ড সরাসরি পরিবারের মা বা নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। এর ফলে পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নারীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
যেভাবে নির্বাচন হবে সুবিধাভোগী পরিবার
পরিবার নির্বাচন করা হবে একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রক্সি মিনস টেস্ট (PMT) স্কোরের মাধ্যমে।
PMT স্কোর অনুযায়ী প্রথম তিনটি কোয়ান্টাইলের পরিবার নগদ সহায়তা পাবে:
১ম কোয়ান্টাইল (০-৭৭৭) — অতি দরিদ্র
২য় কোয়ান্টাইল (৭৭৮-৭৯৬) — দরিদ্র
৩য় কোয়ান্টাইল (৭৯৭-৮১৪) — ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত
গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ ০.৫০ একর বা তার কম জমি থাকলে যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে।
মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে
নির্বাচিত পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা সরাসরি দেওয়া হবে।
অর্থ বিতরণ করা হবে G2P (Government to Person) পদ্ধতিতে, অর্থাৎ—
সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে
অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি)
এছাড়া ভবিষ্যতে এই কার্ডের মাধ্যমে—
টিসিবি পণ্য
শিক্ষা উপবৃত্তি
কৃষি ভর্তুকি
একই প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া যাবে।
প্রথম ধাপে ১০ হাজার পরিবার
পাইলট কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে ১৪টি অঞ্চলে ১০,০০০ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পর্যায়ক্রমে জুন ২০২৬ এর মধ্যে ৪০,০০০ পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় আসবে।
পাইলট পর্যায়ে মোট ৩ লক্ষ ২০ হাজার পরিবার জরিপের আওতায় আনা হবে।
যেসব এলাকায় শুরু হচ্ছে পাইলট কর্মসূচি
পাইলট প্রকল্পটি দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের ১৪টি এলাকায় চালু হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—
ঢাকার কড়াইল বস্তি
মিরপুর অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা
বান্দরবানের লামা
সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওর এলাকা)
ঠাকুরগাঁও সদর
রাজবাড়ীর পাংশা
ভোলার চরফ্যাশন
খুলনার খালিশপুর
কিশোরগঞ্জের ভৈরব
বগুড়া সদর
নাটোরের লালপুর
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ
বাস্তবায়ন সময়সূচি
ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রকল্পের প্রধান ধাপগুলো হলো—
২৪ ফেব্রুয়ারি – ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কারিগরি প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ
২৬ ফেব্রুয়ারি – ২ মার্চ
বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ
২ মার্চ – ৪ মার্চ
ডাটা এন্ট্রি ও PMT স্কোরিং
৫ মার্চ – ৭ মার্চ
লাইভ ভেরিফিকেশন
৭ মার্চ – ৯ মার্চ
চূড়ান্ত অনুমোদন ও স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং
১০ মার্চ ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে উদ্বোধন ও নগদ অর্থ বিতরণ
অভিযোগ করলে মিলবে সমাধান
এই কর্মসূচির জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS) রাখা হয়েছে।
অভিযোগ করা যাবে—
হটলাইন ১০৯৮
জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট
ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে
প্রতিটি অভিযোগ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে।
৩৮ কোটি টাকার বাজেট
চার মাস মেয়াদি এই পাইলট কর্মসূচির জন্য মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বাজেট ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে—
২৫.১৫ কোটি টাকা সরাসরি দরিদ্র পরিবারকে দেওয়া হবে
বাকি অর্থ তথ্য সংগ্রহ, কার্ড প্রিন্টিং, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হবে
২০৩০ সালের লক্ষ্য
সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি “সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড” এ রূপান্তর করা।
এর মাধ্যমে দেশের সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একীভূত করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ স্বাক্ষরিত গাইডলাইনে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করবে।
ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬
বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
বাস্তবায়নকারী সংস্থা: সমাজসেবা অধিদপ্তর
সারসংক্ষেপ
নারীর ক্ষমতাযনের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করন, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নযনের লক্ষ্যে 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেয়া হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর 'ফ্যামিলি কার্ড' পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে "ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক"। বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ (Double-dipping) এবং উল্লেখযোগ্য শতাংশ প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো ত্রুটিগুলো দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি 'সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড'-এ রূপান্তর করা।
সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে 'প্রক্সি মিনস টেস্ট' (PMT) স্কোরিং ব্যবহার করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে ১ম, ২য় ও ৩য় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে দারিদ্র্যের এ ধাপ পুন:নির্ধারণ করা যাবে। গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই কার্ডটি সরাসরি পরিবারের 'মা' বা 'নারী প্রধান' সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে।
পাইলট কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ 'জিটুপি' (G2P) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের 'ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি' (DSR)-এ স্থানান্তর করা হবে। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ভবিষ্যতে একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে API স্থাপন কিংবা ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আনুসংগিক খরচ বহন করবে, তবে ডাটা সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি লক্ষ্যমাত্রা এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সার্বিক তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতি নির্ধারণ করবে এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কারিগরি ও ডাটা ম্যানেজমেন্ট কমিটি সার্বিক তত্ত্বাবধান-করবে। উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে পৃথক বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৪টি ভিন্ন বৈচিত্রের এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি, মিরপুরের অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ী বস্তি (শহরে বস্তি), চট্টগ্রামের পতেঙ্গা (শিল্প এলাকা), বান্দরবানের লামা (পার্বত্য এলাকা), সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওর এলাকা) এবং ঠাকুরগাঁও সদর (সীমান্তবর্তী এলাকা) মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবায়ন রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ০২ মার্চ পর্যন্ত ওয়ার্ড কমিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেক পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত ডাটা অনলাইনে এন্ট্রি ও পিএমটি স্কোরিং শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মীরা সরেজমিনে 'লাইভ ভেরিফিকেশন' করবেন। ৭ ও৮ মার্চ চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণ করা হবে। সকল প্রস্তুতি শেষে ১০ মার্চ ২০২৬ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন এবং উদ্বোধনের সাথে সাথেই সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে/ব্যাংক হিসাবে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে যাবে। পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ইউনিটে ১০,০০০ পরিবারকে এ কার্ড প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে প্রতি ধাপে ১০,০০০ করে বৃদ্ধি করে জুন ২০২৬ এর মধ্যে বিভিন্ন ইউনিটে ৪০০০০ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত করা হবে। তবে জরিপকৃত সকল পরিবারকেই ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। এই পাইলটিং কর্মসূচির জন্য ০৪ মাসে (মার্চ-জুন, ২০২৬) মোট ৩৮ কোটি ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন হবে, যার ৬৬ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে। এটি বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে।
১. পটভূমি ও ভূমিকা (Background and Introduction)
১.১ সাংবিধানিক ভিত্তি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার।
১.২ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে বাংলাদেশে ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয়। এর ফলে সমন্বয়হীনতা, দ্বৈততা (Double-dipping) এবং প্রায় উল্লেখযোগ্য শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার (Targeting Error) মতো সমস্যা বিদ্যমান। বিদ্যমান টিসিবি বা অন্যান্য কার্ড ব্যবস্থা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে।
১.৩ নীতিনির্ধারণী দর্শন (Policy Philosophy)
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ও পলিসি পেপারের মূল দর্শন হলো- "ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক"।
এই দর্শনের আওতায়:
নারীর ক্ষমতায়ন: কার্ডটি সরাসরি পরিবারের 'মা' বা 'নারী প্রধান' এর নামে ইস্যু করে সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হবে।
উন্নয়ন সিঁড়ি (Graduation Ladder): এটি কেবল একটি অনুদান নয়, বরং দরিদ্র পরিবারকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার একটি মাধ্যম।
২. সংজ্ঞা (Definitions)
.
পরিবার (Family): একই রান্নাঘরে খাবার খায় এবং একত্রে বসবাস করে এমন ব্যক্তিদের সমষ্টি, গড়ে সাধারণতঃ ৫ জন সদস্য সম্বলিত।
নারী প্রধান (Female Head): পরিবারের মা বা জ্যেষ্ঠ নারী সদস্য যার নামে কার্ড ইস্যু হবে।
পিএমটি (PMT): প্রক্সি মিনস টেস্ট, যা সম্পদ মালিকানার ভিত্তিতে দারিদ্র্য নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
কোয়ান্টাইল (Quantile): পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে জনসংখ্যার ৫টি সমান অর্থনৈতিক স্তর।
জিটুপি (Government to Person-G2P): সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রেরণের মাধ্যম।
৩. ভিশন, মিশন ও লক্ষ্যমাত্রা
৩.১ ডিশন ২০৩০
২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি "সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড" হিসেবে রূপান্তর করা।
৩.২ মিশন
একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্বাবলম্বীকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩.৩ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা
১. পাইলটিং ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০,০০০ (মার্চ-২০২৬); ২য় পর্যায়ে ১০,০০০ (এপ্রিল-২০২৬), ৩য় পর্যায়ে ১০,০০০ (মে ২০২৬), চতুর্থ পর্যায়ে ১০০০০ (জুন ২০২৬) মোট ৪০,০০০ দরিদ্র পরিবার নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। পরবর্তীতে এই ভাতাভোগীগণের ভাতা প্রদান অব্যাহত থাকবে।
২. পাইলটিং এ জরিপভুক্ত বা তথ্য পূরণকারী সকল পরিবারকেই (Universal) ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে; তবে নগদ সহায়তা পাবেন পিএমটি স্কোর অনুযায়ী।
৩. এক্ষেত্রে পাইলটিং লক্ষ্যমাত্রা ৩ লক্ষ ২০ হাজার পরিবার। পাইলটিং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের ২ কোটি দরিদ্র পরিবারকে কার্ড প্রদান করা হবে।
৪. সকল নগদ অর্থ সহায়তা ও টিসিবি সহায়তাকে একক কার্ডের অধীনে নিয়ে আসা।
৫. ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট জিডিপি-র ৩ শতাংশে উন্নীত করা।
৪. প্রার্থী নির্বাচনের মানদণ্ড ও যোগ্যতা
৪.১ পিএমটি স্কোরিং ও কোয়ান্টাইল
পরিবার নির্বাচনে কোনো প্রকার বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে কোয়ান্টাইল নির্ধারণ করবে:
.
১ম কোয়ান্টাইল (০-৭৭৭): অতি দরিদ্র (আবশ্যিক অন্তর্ভুক্ত)।
২য় কোয়ান্টাইল (৭৭৮-৭৯৬): দরিদ্র (পাইলট পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত)।
৩য় কোয়ান্টাইল (৭৯৭-৮১৪): ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত (পাইলট পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত)।
প্রাথমিক পর্যায়ে এ তিন কোয়ান্টাইল তথা অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবার ফ্যামিলি কার্ড ভাতা পাবেন।
৪.২ সম্পদের মানদন্ড
গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম হতে হবে।
৪.৩ ফ্যামিলি কার্ড প্রাপ্তির শর্তাবলী
(ক) ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি যদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিসিবি কর্তৃক ইস্যুকৃত স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড অথবা খাদ্য মন্ত্রণালয় আওতাভুক্ত খাদ্য বন্ধব কর্মসূচি অথবা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত ভালনারেবল উইম্যান বেনিফিট (VWB) এর সুবিধাভোগী হন, সেক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড প্রাপ্তির জন্য বিদ্যমান সুবিধা সারেন্ডার করতে হবে।
(খ) খানা প্রধান নারী ব্যতীত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্যান্য ভাতা গ্রহণ অব্যহত থাকবে, তবে নারী খানা প্রধান ফ্যামিলি কার্ড ব্যাতীত অন্য কোন ভাতা গ্রহণ করতে পারবে না।
৫. শুধমাত্র পাইলটিংএ নগদ সহায়তা প্রাপ্যতা বর্হিভূত
১. পিএমটি স্কোর ৮১৪-এর উপরে থাকলে।
২. পরিবারের কেউ সরকারি/স্বায়ত্বশাসিত/রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান হতে বেতন/ভাতা/অনুদান/পেনশন পেয়ে থাকলে।
৩. এমপিওভুক্ত শিক্ষক/কর্মচারী হলে।
৪. পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে।
৫. বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন- গাড়ি, এসি) থাকলে।
৬. ৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে।
৬. সুবিধা পরিশোধ পদ্ধতি ও সমন্বয়
৬.১ জিটুপি (G2P) ও নগদ ভাতা
. পাইলট পর্যায়ে প্রতিটি নির্বাচিত পরিবার মাসিক ন্যূনতম ২,৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাবে।
উপকারভোগীগণ নগদ সহায়তার অর্থ তার পছন্দ অনুযায়ী যে কোন তফসিলী ব্যাংক অথবা মোবাইল ফাইন্যন্সিয়াল সার্ভিস এর মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। তবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ক্ষেত্রে উপকারভোগীর জাতীয় পরিচয় পত্রের বিপরীতে মোবাইল সিমের নিবন্ধন থাকতে হবে।
. অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুবিধাভোগী নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা মোবাইল ওয়ালেট জমা হবে।
.
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে বা POS মেশিন থেকে টাকা উত্তোলন করা যাবে।
৬.২ টিসিবি ও অন্যান্য সেবার সমন্বয়
পরবর্তীতে বিদ্যমান টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য দপ্তরসমূহের নগদ সহায়তা/ভাতা সুবিধাদি সংশ্লিষ্ট ডাটা বেইজ API এর মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (DSR)-এ স্থানান্তরিত হবে।
ভবিষ্যতে এ ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকি ইত্যাদি সহকল সরকারি সহায়তা ধারাবাহিকভাবে এ কার্ডের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে।
সমন্বয়কৃত কর্মসূচিসমূহের বাজেট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিক্ষা/কৃষি/বাণিজ্য) বহন করবে কিন্তু ডাটা যাচাই করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এছাড়া সামগ্রিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীটির সাচিবিক সহায়তা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পালন করবে।
৭. বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটিসমূহ (বিস্তারিত সংযুক্তি-১)
৭.১ মন্ত্রিসভা কমিটি (Cabinet Committee)
সভাপতি: মন্ত্রী,
অর্থ মন্ত্রণালয়। সদস্য সচিব: সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
৭.২ কেন্দ্রীয় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটি (Central Monitoring and Evaluation Committee)
সভাপতি: সচিব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
সদস্য: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর/অধিদপ্তর প্রধানগণের প্রতিনিধি এবং এনআইডি, বিবিএস ও জন্ম নিবন্ধন অফিসের প্রতিনিধি।
সদস্য সচিব: মহাপরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর
৭.৩ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা কমিটি (Technical and Management Committee)
সভাপতি: মহাপরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর।
সদস্য: সমাজকল্যাণ ও আইসিটি বিভাগের সিস্টেম এনালিস্ট, এনআইডি, বিবিএস, জন্ম নিবন্ধন অফিস ও অর্থ বিভাগের iBAS++ এর প্রতিনিধি।
সদস্য সচিব: পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা), সমাজসেবা অধিদপ্তর
৭.৪ মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন কমিটিসমূহ (সংযুক্তি-১)
৭.৪.১ ওয়ার্ড কমিটি (তৃণমূল পর্যায় তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক যাচাই)
দায়িত্ব: আবেদন ফর্ম মোতাবেক অফলাইনে সকল পরিবারের তথ্য সংগ্রহ, পিএমটি ফরম পূরণ এবং এনআইডি যাচাই।
৭.৪.২ ইউনিয়ন/পৌর কমিটি (সুপারভিশন ও তালিকা প্রণয়ন)
দায়িত্ব: ওয়ার্ড কমিটির তথ্য যাচাই, পিএমটি স্কোর অনুযায়ী শর্টলিস্ট তৈরী এবং খসড়া তালিকায় সুপারিশ প্রণয়ন।
৭.৪.৩ উপজেলা/শহর কমিটি (চূড়ান্ত অনুমোদন)
গঠন: ইউএনও/আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (আহ্বায়ক), এসিল্যান্ড, কৃষি অফিসার, সমাজসেবা অফিসার (সদস্য সচিব)।
. দায়িত্ব: ইউনিয়ন/পৌর কমিটির সুপারিশকৃত তালিকা চূড়ান্ত করা এবং ডাটাবেজ লক করা।
৭.৪.৪ জেলা কমিটি (আপিল ও মনিটরিং) দায়িত্ব: সার্বিক মনিটরিং এবং অভিযোগ (GRS) নিষ্পত্তি।
৮. বাস্তবায়ন পদ্ধতি
১. কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি (২২- ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬):
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে (MIS) ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নতুন মডিউল যুক্ত করা হবে। ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে নীতিমালা অনুমোদন করা হবে। একই সাথে পাইলট এলাকার কর্মকর্তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
২. অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ (২৬-২ মার্চ ২০২৬):
প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটি অথবা উপজেলা/শহর কমিটি কমিটি কর্তৃক নিয়োগকৃত সরকারি কর্মচারীগণ বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকল পরিবারের তথ্য অফলাইনে আবেদন ফর্মে তথ্য সংগ্রহ করবে। পরিবার প্রধানের (নারী) এনআইডি, নিজস্ব মোবাইল নম্বর এবং ঘরের ধরন ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে একটি প্রাথমিক ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। তথ্য সংগ্রহের জন্য পরিবার প্রতি সরকার নির্ধারিত হারে তথ্য সংগ্রহকারীকে অর্থ প্রদান করা হবে।
-৩. অনলাইন ডাটা এন্ট্রি এবং পিএমটি স্কোরিং ও প্রাথমিক বাছাই (০২ ০৪ মার্চ ২০২৬):
সংগৃহীত তথ্যগুলো উপজেলা সমাজসেবা অফিস বা শহর সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে অনলাইনে এন্ট্রি দেওয়া হবে। প্রতিটি সফল এন্ট্রির জন্য ডাটা এন্ট্রি অপারেটরকে নির্ধারিত হারে ফি প্রদান করা হবে। এন্ট্রিকৃত পরিবারের তথ্যসমূহ পিএমটি (PMT) স্কোরিং ইঞ্জিনে যাচাই করা হবে। স্কোর অনুযায়ী ১ম, ২য় ও ৩য় কোয়ান্টাইলভুক্ত (০-৮১৪ স্কোর) দরিদ্র পরিবারগুলোকে আলাদা করা হবে এবং সচ্ছল পরিবারসমূহকে প্রাথমিক পর্যায়ে ভাতা প্রদানের আওতা বর্হিভূত রাখা হবে।
৪. লাইভ ভেরিফিকেশন (০৫-০৭ মার্চ ২০২৬):
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমাজকর্মীরা সরেজমিনে নির্বাচিত পরিবারগুলোর বাড়িতে যাবেন। সেখানে আবেদনকারী নারী এবং তার দেয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করবেন।
৫. চুড়ান্ত অনুমোদন ও স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত (০৭-০৯ মার্চ ২০২৬):
উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটি ভেরিফাইড তালিকাটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে ডাটাবেজ 'লক' করে দিবে। এরপর দ্রুততম সময়ে কিউআর কোড যুক্ত স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রিন্টিং সম্পন্ন করা হবে এবং সুবিধাভোগীদের মোবাইলে কার্ড সংগ্রহের এসএমএস পাঠানো হবে।
৭. উদ্বোধন ও সরাসরি অর্থ প্রদান (১০ মার্চ ২০২৬):
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কার্যক্রমটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনের সাথে সাথেই জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে প্রতিটি পরিবারের মোবাইল ওয়ালেটে ২,৫০০ টাকার নগদ সহায়তা পৌঁছে যাবে।
৯. বাস্তবায়ন রোডম্যাপ (২৪ ফেব্রুয়ারি – ১০ মার্চ ২০২৬) -
১. কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি (২২ ফেব্রুয়ারি ২৬ ফেব্রুয়ারি)
সমাজসেবা অধিদপ্তরের MIS-এ নতুন মডিউল তৈরি ও NID API সংযোগ। মন্ত্রিসভা কর্তৃক নীতিমালা অনুমোদন ও সরকারি গেজেট প্রকাশ।
১৪টি পাইলট ইউনিটের কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল ওরিয়েন্টেশন।
২. অফলাইন তথ্য সংগ্রহ ওয়ার্ড কমিটি (২৬ ফেব্রুয়ারি- ০২ মার্চ)
ওয়ার্ড কমিটি কর্তৃক বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকল পরিবারের তথ্য সংগ্রহ। কাগজের ফর্মে থেকে পিএমটি (PMT) সূচকসমূহ তৈরী। এনআইডি এবং জন্ম নিবন্ধনের কপি সংগ্রহ।
৩. প্রাথমিক যাচাই ও পিএমটি স্কোরিং (০২-০৪ মার্চ)
সংগৃহীত ডাটা হতে পিএমটি স্কোর (০-৮১৪) অনুযায়ী শর্টলিস্ট। সচ্ছল বা অযোগ্য পরিবারসমূহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ প্রদান।
৪. সরেজমিনে 'লাইভ ভেরিফিকেশন' (০৫-০৭ মার্চ)
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারী কর্তৃক বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই।
৫. চূড়ান্ত অনুমোদন ও ডাটাবেজ লক (০৭-০৯ মার্চ)
উপজেলা/আঞ্চলিক বাস্তবায়ন কমিটি কর্তৃক তালিকার চূড়ান্ত অনুমোদন। সিস্টেমে ডাটাবেজ 'লক' করে অর্থ বিভাগ (iBAS++) এ তথ্য প্রেরণ।
৬. স্মার্ট কার্ড ও মেসেজ প্রদান (০৯ মার্চ)
৭. কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রিন্টিং। সুবিধাভোগীদের মোবাইলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় ও স্থান জানিয়ে SMS প্রদান।
৮. গ্র্যান্ড উদ্বোধন ও অর্থ প্রদান (১০ মার্চ ২০২৬)
১০. পাইলট ইউনিটের তালিকা ১৪টি এলাকা (বিস্তারিত সংযুক্তি-২) -
১. ঢাকা, বনানী (কড়াইল বস্তি), ২. ঢাকা, মিরপুর (অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ী বস্তি), ৩. পাংশা (রাজবাড়ী), ৪. পতেঙ্গা (চট্টগ্রাম), ৫. বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), ৬. লামা (বান্দরবান), ৭. খালিশপুর (খুলনা), ৮. চরফ্যাশন (ভোলা), ৯. দিরাই (সুনামগঞ্জ), ১০. ভৈরব (কিশোরগঞ্জ), ১১. বগুড়া সদর, ১১২. লালপুর (নাটোর), ১৩. ঠাকুরগাঁও সদর, ১৪. নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)।
১১. অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা (Grievance Redress System - GRS)
ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। এর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
. হটলাইন ও ১০৯৮ সেবা: ফ্যামিলি কার্ডের জন্য শীঘ্রই একটি নতুন নিবেদিত “হটলাইন” চালু করা হবে। উক্ত হটলাইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিদ্যমান "চাইল্ড হেল্প লাইন ১০৯৮"-এ কল করে ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম বা সমস্যার অভিযোগ প্রদান করা যাবে।
অভিযোগ দাখিলের মাধ্যম: অনলাইন অথবা ম্যানুয়ালি এ দুটির যেকোন একটি মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এক্ষেত্রে নাগরিকগণ সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট এবং ৩৩৩ হেল্পলাইন-এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এছাড়াও সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা/শহর সমাজসেবা অফিসে লিখিত অভিযোগ দেওয়া যাবে।
অভিযোগের ধরণ: যোগ্য পরিবার বাদ পড়া, স্বচ্ছল পরিবারের অন্তর্ভুক্তি, অনিয়ম, দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলে বা অর্থ প্রাপ্তিতে কারিগরি ত্রুটির বিষয়ে প্রতিকার চাওয়া যাবে।
নিষ্পত্তি ও সময়সীমা: প্রতিটি অভিযোগ প্রাপ্তির পরবর্তী সর্বোচ্চ ১৫ (পনের) কার্যদিবসের মধ্যে তা স্থানীয়ভাবে গণশুনানী নিয়ে প্রয়োজনে তদন্তপূর্বক নিষ্পত্তি করা হবে এবং সিদ্ধান্তটি সুবিধাভোগীকে অবহিত করা হবে।
আপিল ব্যবস্থা: উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা ফ্যামিলি কার্ড আপিল কমিটির (সভাপতি: জেলা প্রশাসক) নিকট আবেদন করা যাবে, যা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সমাধান করা হবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও নিরীক্ষা: তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতি মাসে অন্তত একবার উপজেলার ইউনিয়ন এবং সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ড পর্যায়ে গণশুনানি বা সামাজিক নিরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
১২. বাজেট (বিস্তারিত সংযুক্তি ৩)
"ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচি ২০২৬"-এর সফল বাস্তবায়নের জন্য মোট ৩৮ কোটি ৭ লক্ষ টাকার একটি পূর্ণাঙ্গ ও কারিগরী মানসম্পন্ন বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বাজেটের মূল বিশেষত্ব হলো এটি শুধুমাত্র ৪০,০০০ পরিবারকে নগদ সহায়তা (২৫.১৫ কোটি টাকা) প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ৩ লক্ষ ২০ হাজার পরিবারের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল শুমারি (Census) নিশ্চিত করবে। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাতায়াত ভাতার জন্য বরাদ্দের ১২.৬১ শতাংশ এবং উন্নত মানের কিউআর কোড যুক্ত স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য ১৩.৩৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে। এছাড়াও তদারকি কমিটির সম্মানী, কর্মকর্তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ডাটা এন্ট্রি এবং ১০ মার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই বাজেটটি বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও 'জিরো লিকেজ' ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
১৩. উপসংহার:
ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন গাইডলাইন বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। এর মূল দর্শন হলো- "ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক"। এই কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিতরণে প্রচলিত অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর কাঠামো নিশ্চিত করেছে।
এই কার্যক্রমের অনন্য দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। পরিবারের মায়ের নামে কার্ড ইস্যু করার মাধ্যমে সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পিএমটি (PMT) স্কোরিং এবং ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (DSR) ব্যবহারের ফলে প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, যা সামাজিক নিরাপত্তাকে সরকারি দয়ার পরিবর্তে 'নাগরিক অধিকারে' রূপান্তর করবে।
২০২৬ সালের এই পাইলটিং কার্যক্রম মূলত ২০৩০ সালের মধ্যে "চরম দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ" গড়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। সকল সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা একই কার্ডে একীভূত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি উন্নত বিশ্বের সমপর্যায়ের "ইউনিভার্সাল সোস্যাল আইডি" ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। সরাসরি জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে অর্থ প্রদান এবং লাইভ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ চিরতরে বন্ধ হবে।
পরিশেষে, ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি আধুনিক সনদ। রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই কার্যক্রম ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যেখানে "কেউ পিছিয়ে থাকবে না" (Leave No One Behind)।
স্বাক্ষরিত
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ
সচিব
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
সম্পুর্ণ পিডিএফ ডাউনলোড




No comments
Your opinion here...