সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা জোরদারে নতুন আইন: অবাধ্যতা ও কর্মবিরতিতে কঠোর শাস্তির বিধান
সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা জোরদারে নতুন আইন: অবাধ্যতা ও কর্মবিরতিতে কঠোর শাস্তির বিধান
ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৬: সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকার ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শীর্ষক একটি বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছে। রবিবার (৫ এপ্রিল) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত এ বিলের মাধ্যমে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন প্রতিরোধের লক্ষ্যে আইনটির সংশোধন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে মূল আইনে নতুন ধারা ‘৩৭ক’ সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের অসদাচরণ এবং তার জন্য শাস্তির বিধান বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অসদাচরণের নতুন সংজ্ঞা
নতুন ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি—
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন,
সরকারের নির্দেশনা বা পরিপত্র বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেন,
অন্য কর্মচারীদের এমন কাজে প্ররোচিত করেন,
কিংবা বৈধ কারণ ছাড়া সমবেতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন বা কর্মবিরতি পালন করেন,
তাহলে তা “সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ” হিসেবে গণ্য হবে।
কঠোর শাস্তির বিধান
এই ধরনের অসদাচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে তিন ধরনের শাস্তি দেওয়া যেতে পারে—
নিম্ন পদ বা বেতন গ্রেডে অবনমিত করা,
বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান,
অথবা চাকরি থেকে বরখাস্ত।
দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
বিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের পর অভিযুক্ত কর্মচারীকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজন হলে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
তদন্ত কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে, যা বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আরও ৭ দিন বাড়ানো যেতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।
জবাবদিহিতা বাড়াতে নতুন ব্যবস্থা
তদন্তে বিলম্ব বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তা সরকারি কর্মচারী বাতায়ন (GEMS)-এর PMIS ও ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করা হবে। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
আপিল ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ
দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের ক্ষেত্রে আপিল করা যাবে না, বরং একই সময়ের মধ্যে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে। আপিল বা রিভিউয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
পূর্বের অধ্যাদেশ বাতিল
এই আইনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের দুটি অধ্যাদেশ—সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং দ্বিতীয় সংশোধন অধ্যাদেশ—বাতিল করা হয়েছে। তবে সেসব অধ্যাদেশের অধীনে গৃহীত কার্যক্রম নতুন আইনের অধীনে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
বিলটি ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মোঃ আব্দুল বারী সংসদে উত্থাপন করেন এবং সচিব ব্যারিস্টার মোঃ গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া এতে স্বাক্ষর করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংশোধন কার্যকর হলে সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে, তবে এর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশ গেজেট
অতিরিক্ত সংখ্যা
কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রকাশিত
রবিবার, এপ্রিল ৫, ২০২৬
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ
ঢাকা, ২২ চৈত্র, ১৪৩২ মোতাবেক ০৫ এপ্রিল, ২০২৬
নিম্নলিখিত বিলটি ২২ চৈত্র, ১৪৩২ মোতাবেক ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে
উত্থাপিত হইয়াছে:-
বা. জা. স. বিল নং ০১/২০২৬
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৫৭ নং আইন)
সংশোধনকল্পে আনীত বিল
যেহেতু নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যসমূহ পূরণকল্পে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৫৭ নং আইন) সংশোধন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;
সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল:-
১। সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন। (১) এই আইন সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত হইবে।
(২) ইহা অবিলম্বে কার্যকর হইবে।
২। ২০১৮ সনের ৫৭ নং আইনে ধারা ৩৭ক এর সন্নিবেশ। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৫৭ নং আইন) এর ধারা ৩৭ এর পর নিম্নরূপ নূতন ধারা ৩৭ক সন্নিবেশিত হইবে, যথা:-
"৩৭ক। সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দন্ড সংক্রান্ত বিশেষ বিধান। (১) এই আইন বা এই আইনের অধীন প্রণীত বিধিমালায় যাহা কিছুই থাকুক না কেন, যদি কোনো সরকারি কর্মচারী
(ক) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন, আইনসংগত কারণ ব্যতিরেকে সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র এবং নির্দেশ অমান্য করেন বা উহার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেন বা এই সকল কার্যে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করেন, বা
(খ) ছুটি বা যুক্তিসংগত কোনো কারণ ব্যতীত অন্যান্য কর্মচারীদের সহিত সমবেতভাবে নিজ কর্ম হইতে অনুপস্থিত থাকেন বা বিরত থাকেন, বা
(গ) যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তাহার কর্মে উপস্থিত হইতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করেন,
তাহা হইলে উহা হইবে সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ এবং তজ্জন্য তিনি উপ-ধারা
(২) এ বর্ণিত যেকোনো দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।
(২) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত কোনো কর্মের জন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে নিম্নবর্ণিত যেকোনো দণ্ড প্রদান করা যাইবে, যথা:-
(ক) নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ;
(খ) বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান; এবং
(গ) চাকরি হইতে বরখাস্ত।
(৩) যেক্ষেত্রে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত কোনো অসদাচরণের জন্য কার্যধারা গ্রহণ করা হয়, সেইক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অথবা এতদুদ্দেশ্যে তৎকর্তৃক, সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অভিযোগ গঠন করিবেন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীকে, অতঃপর অভিযুক্ত ব্যক্তি বলিয়া অভিহিত, কেন এই ধারার অধীন দোষী সাব্যস্তপূর্বক দণ্ড আরোপ করা হইবে না এই মর্মে ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে যথাযথভাবে কারণ দর্শাইবার নোটিশ প্রদান করিবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হইয়া শুনানি করিতে ইচ্ছুক কি না ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাহাও উক্ত নোটিশে উল্লেখ করিবেন।
(৪) অভিযুক্ত ব্যক্তি কারণ দর্শাইলে উহা বিবেচনার পর এবং, ক্ষেত্রমত, তিনি ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হইলে শুনানি গ্রহণের পর, যদি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা অভিযোগ গঠনকারী ব্যক্তির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যধারা গ্রহণ করিবার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি রহিয়াছে, অথবা যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি কারণ না দর্শাইয়া থাকেন, তাহা হইলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা অভিযোগ গঠনকারী ব্যক্তি তদন্তের জন্য ৩ (তিন) কার্যদিবসের মধ্যে ৩ (তিন) সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করিবেন।
(৫) তদন্ত কমিটির সদস্যগণ অভিযুক্ত ব্যক্তি অপেক্ষা কর্মে জ্যেষ্ঠ হইবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী হইলে তদন্ত কমিটিতে আবশ্যিকভাবে একজন নারী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে।
(৬) তদন্ত কমিটি তদন্তের আদেশ প্রাপ্তির তারিখ হইতে পরবর্তী ১৪ (চৌদ্দ) কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করিয়া প্রতিবেদন দাখিল করিবে:
তবে শর্ত থাকে যে, যুক্তিসংগত কোনো কারণে উক্ত সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজন হইলে উহা কেবল একবারের জন্য অনধিক ৭ (সাত) কার্যদিবস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যাইবে।
(৭) তদন্ত কমিটি উপ-ধারা (৬) এ বর্ণিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করিতে না পারিলে নূতন তদন্ত কমিটি গঠন করিতে হইবে এবং উক্ত নূতন তদন্ত কমিটি উপ-ধারা (৬) এ বর্ণিত সময়সীমা অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন করিবে।
(৮) তদন্ত কমিটি যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিরেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করিতে ব্যর্থ হইলে উহা তদন্ত কমিটির সদস্যদের অদক্ষতা হিসাবে বিবেচিত হইবে এবং এইরূপ অদক্ষতার বিষয়টি, ক্ষেত্রমত, তাহাদের সরকারি কর্মচারী বাতায়ন (GEMS) এর Personnel Management Information System (PMIS) এবং ডোসিয়ারে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষিত থাকিবে এবং চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী তাহাদের বিরুদ্ধে দণ্ডমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।
(৯) তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা অভিযোগ গঠনকারী ব্যক্তি উহা বিবেচনাপূর্বক অভিযোগ ও, ক্ষেত্রমত, দণ্ডের বিষয়ে উহার সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করিবে এবং উক্ত সিদ্ধান্ত, তদন্ত প্রতিবেদনের কপিসহ, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যথাথভাবে প্রেরণ করিবে।
(১০) কোনো সরকারি কর্মচারীকে দণ্ড প্রদান করা হইলে, তিনি দণ্ড আরোপের আদেশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে ধারা ৩৪ এর অধীন আপিল করিতে পারিবেন এবং আপিল কর্তৃপক্ষ উক্ত আদেশ বহাল রাখিতে, বাতিল করিতে বা পরিবর্তন করিতে পারিবে।
(১১) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যাইবে না, তবে এইরূপ ক্ষেত্রে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারী দণ্ড আরোপের আদেশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে ধারা ৩৬ অনুযায়ী উক্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার (review) জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট আবেদন করিতে পারিবেন এবং রাষ্ট্রপতি যেরূপ উপযুক্ত মনে করিবেন, সেইরূপ আদেশ প্রদান করিবেন।
(১২) উপ-ধারা (১০) ও (১১) এর অধীন, যথাক্রমে, আপিল ও রিভিউ এ প্রদত্ত আদেশ চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।”।
৩। রহিতকরণ ও হেফাজত। (১) সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫
সনের ২৬ নং অধ্যাদেশ) এবং সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সনের ৩৭ নং অধ্যাদেশ) এতদ্দ্বারা রহিত করা হইল।
(২) উক্তরূপ রহিতকরণ সত্ত্বেও উক্ত অধ্যাদেশ দুইটির অধীন কৃত কার্য বা গৃহীত ব্যবস্থা এই আইনের অধীন কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।
মোঃ আব্দুল বারী
ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী।
ব্যারিস্টার মোঃ গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া
সচিব।
PDF Download






No comments
Your opinion here...