সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে সিলেট বিভাগে ১৯ দফা নির্দেশনা: একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে সিলেট বিভাগে ১৯ দফা নির্দেশনা: একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও শিখন ফলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে সিলেট বিভাগ থেকে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার স্বাক্ষরিত স্মারকে ১৯ দফা নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যা বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতিতে একটি নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্দেশনার পটভূমি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন এবং নিয়মিত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিদ্যালয় পরিদর্শন করে থাকেন। এই পরিদর্শনের আলোকে শিক্ষার মান উন্নয়ন, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ নির্দেশনাগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী ভর্তি ও উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ
নির্দেশনার প্রথম দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ক্যাচমেন্ট এলাকার শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার ওপর। শিশু জরিপের মাধ্যমে বিদ্যালয়গামী শিশুদের চিহ্নিত করে তাদের শিক্ষার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আগমন ও প্রস্থান নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়মিত পাঠদানের পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক মিলনায়তন, বারান্দা, আঙ্গিনা ও ওয়াশ ব্লক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ফুলের বাগান করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আনন্দময় ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি করবে।
পাঠদান ও শিখন ফলভিত্তিক মূল্যায়ন
শ্রেণি কার্যক্রম বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও অনুমোদিত রুটিন অনুযায়ী পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকরা শিখন ফলভিত্তিক পাঠ উপকরণ নিয়ে ক্লাসে যাবেন এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি শিখন ফলের আলোকে মূল্যায়ন করবেন। পাঠদানে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহারের নির্দেশনা আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
বেইজলাইন জরিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠগত অবস্থান নির্ধারণ করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও বাড়তি যত্ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়ে।
ভাষা দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি
তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শতভাগ বাংলা ও ইংরেজি রিডিং পড়া নিশ্চিত করার নির্দেশ রয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের সৃজনশীল উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত করার কথা বলা হয়েছে।
সহশিক্ষা কার্যক্রম ও তথ্য ব্যবস্থাপনা
প্রতিটি বিদ্যালয়ে কাব দল গঠন ও কাব কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের সকল তথ্য ও IPEMIS তথ্য হালনাগাদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনায় সহায়ক হবে।
হাতের লেখা ও প্রাক-প্রাথমিক কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা উন্নয়নের জন্য প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বাড়ির কাজ হিসেবে হাতের লেখা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ ও নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
উপসংহার
এই ১৯ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেট বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শিখন ফল উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক মানোন্নয়নে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতা, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবায়নের ওপর। সবাই মিলে কাজ করলে প্রাথমিক শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়
প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগ, সিলেট
www.dpe.sylhetdiv.gov.bd
স্মারক নম্বর: ৩৮,০১,৬০০০,০০০০,১৮,০০২,১৮,৫০
তারিখ: ২১.০১.২০২৬খ্রি.
বিষয়: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্নবর্নিত নির্দেশনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে।
উপর্যুক্ত বিষয়ের প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন এবং বিভাগ বর্হিভূত কর্মকর্তাগণ পরিদর্শন করে থাকেন। পরিদর্শনের আলোকে নিম্নবর্নিত নির্দেশনা/সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করার জন্য অনুরোধ করা হলো:
১) শিশু জরিপের মধ্যেমে ক্যাচমেন্ট এলাকার শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা।
২) সঠিক রঙ ও সঠিক মাপের জাতীয় পতাকা ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৩) বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক মিলনায়তন, বারান্দা, আঙ্গিনা এবং ওয়াশ ব্লক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
৪) প্রতিটি বিদ্যালয়ে ফুলের বাগান করে সৌন্দর্য বর্ধন করা।
৫) যথা সময়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে আগমন ও প্রস্থান নিশ্চিত করা।
৬) শিক্ষার্থীদের শতভাগ ইউনিফর্ম নিশ্চিত করা।
৭) শ্রেণি পাঠদানকালীন শ্রেণি কক্ষে মোবাইল ব্যবহার না করা।
৮) সকল শিক্ষকের উপস্থিতিতে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে সমাবেশ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৯) বার্ষিক কর্ম পরিকল্পনা ও অনুমোদিত রুটিনের আলোকে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা।
১০ ) শিখন ফল ভিত্তিক পাঠ সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে ক্লাসে যাওয়া ও শিখল ফলভিত্তিক মূল্যায়ন করে শিখন ফল অর্জন নিশ্চিত করা।
১১) বেইজ লাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠগত অবস্থান নির্ধারণ করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১২) ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণি শিক্ষার্থীদের শতভাগ বাংলা ও ইংরেজি রিডিং পড়া নিশ্চিত করা।
১৩) সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের সৃজনশীল উপকরণ দ্বারা শ্রেণিকক্ষ সজ্জিত করা।
১৪) পাঠদানে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করা।
১৫) স্লিপ ফান্ডে ক্রয়কৃত মালামালের বছরওয়ারী তালিকা তৈরি করে রাখা।
১৬) প্রতিটি বিদ্যালয়ে কাব দল গঠন নিশ্চিত করা ও কাব কার্যক্রম জোরদার করা।
১৭) বিদ্যালয়ের সকল তথ্য ও IPEMIS তথ্য হালফিল রাখা।
১৮) প্রাক প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ ও রুটিন মোতাবেক পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা।
১৯) শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা উন্নয়নের জন্য প্রতিদিন ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ হিসাবে হাতের লিখা দেয়া।
শ্রেণি ভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা অর্জনের মধ্যেমে শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিত করতে অনুরোধ করা হলো।
স্বাক্ষরিত
মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার
বিভাগীয় উপপরিচালক
প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগ, সিলেট



No comments
Your opinion here...