প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কাঠামো ও শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি: প্রান্তিক মূল্যায়নের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা ২০২৬
📘 প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কাঠামো ও শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। এই স্তরে সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর শিখন নিশ্চিত করে, দক্ষতা উন্নয়ন করে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। তাই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মূল্যায়ন কার্যক্রম একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এই ব্লগপোস্টে প্রাথমিক স্তরের মূল্যায়ন কাঠামো, নম্বর বণ্টন, উত্তীর্ণের শর্ত এবং শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
📝 ১. মূল্যায়ন কাঠামো
প্রাথমিক স্তরে প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনটি প্রান্তিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি প্রান্তিকে দুই ধরনের মূল্যায়ন করা হয়:
🔹 ক. ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment)
নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। এর অন্তর্ভুক্ত—
পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন করা
শ্রেণিকাজে সক্রিয়তা
ভাষাদক্ষতা/বিষয়বস্তুর বোধগম্যতা
ক্লাস টেস্ট
🔹 খ. সামষ্টিক মূল্যায়ন (Summative Assessment)
প্রতি প্রান্তিক শেষে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।
⚠️ শুধুমাত্র শিক্ষক সহায়িকা নির্ভর বিষয়সমূহে ১০০% ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়।
📚 ২. ধারাবাহিক মূল্যায়নের বিস্তারিত
✅ ক.১ পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন করা
শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করবে।
শিক্ষক প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন প্রদান করবেন।
প্রান্তিক শেষে কাজ যাচাই করে নম্বর প্রদান করা হবে।
অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরবর্তীতে কাজ সম্পন্ন করাতে হবে।
✅ ক.২ শ্রেণিকাজে সক্রিয়তা
শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা যাচাইয়ের সূচকসমূহ:
পাঠসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করা
শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া
দলগত কাজে অংশগ্রহণ
বাড়ির কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা
প্রেজেন্টেশন/রোল-প্লে/প্রজেক্টে অংশগ্রহণ
প্রতি প্রান্তিকে একবার নম্বর প্রদান করা হবে।
✅ ক.৩ ভাষাদক্ষতা ও বোধগম্যতা
বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শোনা, বলা, পড়া ও লেখা — চারটি দক্ষতা মূল্যায়ন।
অন্যান্য বিষয়ে বিষয়বস্তুর বোধগম্যতা মূল্যায়ন।
পর্যবেক্ষণভিত্তিক নোট গ্রহণ ও ফলাবর্তন প্রদান।
✅ ক.৪ ক্লাস টেস্ট
পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক বিষয়ে প্রতি প্রান্তিকে কমপক্ষে ২টি ক্লাস টেস্ট।
শিক্ষক সহায়িকা নির্ভর বিষয়ে কমপক্ষে ১টি।
একাধিক টেস্টের ক্ষেত্রে গড় নম্বর গণনা করা হবে।
🧾 ৩. সামষ্টিক মূল্যায়ন (লিখিত পরীক্ষা)
📌 শ্রেণিভেদে নম্বর
১ম ও ২য় শ্রেণি: ৫০ নম্বর
৩য়–৫ম শ্রেণি: ৭০ নম্বর
📌 প্রশ্নের ধরন (৩য়–৫ম শ্রেণি)
জ্ঞানমূলক
অনুধাবনমূলক
প্রয়োগমূলক
উচ্চতর দক্ষতাভিত্তিক
📊 ৪. শ্রেণিভিত্তিক শতকরা নম্বর বণ্টন
🟢 প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি
ধারাবাহিক মূল্যায়ন – ৫০%
সামষ্টিক মূল্যায়ন – ৫০%
সর্বমোট নম্বর – ৬০০
🔵 তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি
ধারাবাহিক মূল্যায়ন – ৩০%
সামষ্টিক মূল্যায়ন – ৭০%
সর্বমোট নম্বর – ৭০০
🟣 শিক্ষক সহায়িকা নির্ভর বিষয়
১০০% ধারাবাহিক মূল্যায়ন
🎓 ৫. পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণের শর্ত
একজন শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ হতে হলে—
✔️ ন্যূনতম ৮৫% উপস্থিতি থাকতে হবে
✔️ প্রতিটি বিষয়ে কমপক্ষে ৪০% নম্বর (বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য ৩৩%)
✔️ তিন প্রান্তিকের গড় নম্বর কমপক্ষে ৪০% হতে হবে
✔️ সামষ্টিক পরীক্ষায় উপস্থিত থাকতে হবে
অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে বিকল্প পরীক্ষা নেওয়া হবে।
📈 ৬. ফলাফল ও শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন
🔹 প্রক্রিয়া
ধারাবাহিক ও সামষ্টিক নম্বর যোগ করে প্রান্তিক ফল নির্ধারণ।
তিন প্রান্তিকের গড় নির্ণয়।
শতকরা হিসাব করে গ্রেড নির্ধারণ।
🔹 উদাহরণ (তৃতীয় শ্রেণি)
১ম প্রান্তিক: ৫২০
২য় প্রান্তিক: ৬৮০
৩য় প্রান্তিক: ৬১০
গড় = (৫২০ + ৬৮০ + ৬১০) ÷ ৩ = ৬০৩.৩৩
শতকরা = (৬০৩.৩৩ ÷ ৭০০) × ১০০ = ৮৬.১৯%
👉 গ্রেড: A (অতি উত্তম)
🏆 গ্রেড নির্ধারণ ছক
| শতকরা নম্বর | গ্রেড | শিক্ষণ অর্জন |
|---|---|---|
| ৮০% – ১০০% | A | অতি উত্তম |
| ৬০% – ৭৯% | B | উত্তম |
| ৪০% – ৫৯% | C | সন্তোষজনক |
| ০% – ৩৯% | D | সহযোগিতা প্রয়োজন |
👥 অতিরিক্ত নির্দেশনা
অগ্রগতি প্রতিবেদনে উপস্থিতির তথ্য উল্লেখ করতে হবে।
‘সততা’, ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘আচরণ’ বিষয়ে ক/খ/গ মূল্যায়ন করতে হবে।
প্রতি প্রান্তিকে অভিভাবকের স্বাক্ষর নিতে হবে।
৩য় প্রান্তিকে রিপোর্ট কার্ডের কপি অভিভাবককে প্রদান করতে হবে।
অভিভাবক সমাবেশে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি আলোচনা করতে হবে।
✨ উপসংহার
প্রাথমিক স্তরের এই মূল্যায়ন পদ্ধতি শুধু নম্বরভিত্তিক নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নিয়মিত শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়, আর সামষ্টিক মূল্যায়ন তাদের অর্জিত জ্ঞান যাচাই করে।
শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে একজন শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে।
সাধারণ নির্দেশনাবলি
১. মূল্যায়ন কাঠামো
প্রাথমিক স্তরে (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) প্রতি শিক্ষাবর্ষে তিনটি প্রান্তিকে শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। প্রতি প্রান্তিকে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এ অগ্রগতি নিরূপণ করা হবে। পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয় এমন বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে শুধুমাত্র শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান করা হয় এমন বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হবে। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং প্রতি প্রান্তিকে একবার সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সামষ্টিক মূল্যায়ন বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে। প্রতি প্রান্তিকে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের ধরন নিচে দেখানো হলো:
প্রান্তিক মূল্যায়ন
ক. ধারাবাহিক মূল্যায়ন
ক.১ পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন করা
ক.২ শ্রেণিকাজে সক্রিয়তা
ক.৩ ভাষাদক্ষতা/বিষয়বস্তুর বোধগম্যতা
ক.৪ ক্লাস টেস্ট
খ. সামষ্টিক মূল্যায়ন
খ.১ লিখিত
মূল্যায়ন কাঠামোর বিভিন্ন কার্যক্রমের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
ক. ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম
ধারাবাহিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য শিক্ষক সহায়িকার মূল্যায়ন অংশে উল্লিখিত ক্ষেত্র-জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং নির্দেশকসমূহকে বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষার্থী কর্তৃক পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্নকরণ, শ্রেণিকাজে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তা, শিক্ষার্থীদের ভাষা দক্ষতা/বিষয়বস্তুর বোধগম্যতা যাচাই এবং ক্লাস টেস্ট-এর মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে হবে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভবে পরিচালনার জন্য শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বছরব্যাপী পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যক্রম সংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো।
ক.১ পাঠ্যপুস্তক/শিক্ষক সহায়িকার কাজ সম্পন্ন করা
* শিক্ষাক্রমের শিখনফলের আলোকে পাঠ্যপুস্তক/শিক্ষক সহায়িকার বিভিন্ন পাঠে বিভিন্নরকম কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এই কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করলে ধাপে ধাপে তাদের শিখনফল অর্জিত হবে। শিক্ষার্থীরা এ সকল কাজ/অ্যাক্টিভিটি পাঠ্যপুস্তকে লিখবে/সম্পন্ন করবে। শিক্ষক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক-সহায়িকা অনুসরণপূর্বক পাঠ্যপুস্তকের নির্ধারিত জায়গায় শিক্ষার্থীদেরকে কাজ/অ্যাক্টিভিটি সম্পন্ন করতে দেবেন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফলাবর্তনসহ স্বাক্ষর করবেন।
* বিষয়ভিত্তিক এমন কিছু কাজ/অ্যাক্টিভিটি থাকে যেগুলো পাঠ্যপুস্তকে করা সম্ভব নয়, সেগুলো শিক্ষক সহায়িকা অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের করতে দেবেন; যেমন- শোনা ও বলা, রোল-প্লে (ভূমিকাভিনয়), সরব পাঠ, প্রদর্শন, প্রেজেন্টেশন, প্রজেক্ট ওয়ার্ক, হাতেকলমে ব্যবহারিক কাজ ইত্যাদি। এ সকল কাজ/অ্যাক্টিভিটি শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে করবে, এ ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রয়োজনীয় নোট নেবেন এবং শিক্ষার্থীকে ফলাবর্তন প্রদান করবেন।
* প্রতি প্রান্তিক শেষে সকল শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তক/অ্যাক্টিভিটি নোট যাচাই করে শিক্ষক নম্বর প্রদান করবেন। উল্লেখ্য, পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন করার জন্য নম্বর প্রদানের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে এ সকল কাজ সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিখনফল/যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করা।
* কোনো শিক্ষার্থী পাঠ্যপুস্তকের কাজ সম্পন্ন না করলে পরবর্তী সময়ে তাকে দিয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করাতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে কাজ সম্পন্নকারী শিক্ষার্থী এবং অনিয়মিত কাজ সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের পার্থক্যের বিষয়টি শিক্ষক যথাযথভাব শিক্ষার্থীকে অবহিত করবেন।
ক.২ শ্রেণিকাজে সক্রিয়তা
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের 'শ্রেণিকাজে সক্রিয়তা' পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষার্থী সক্রিয় থাকলে তার শিখন অর্জন দ্রুততর হয় এবং সে দায়িত্বশীল হতে শেখে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করবেন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিতে কতটুকু সক্রিয়, তা মূল্যায়ন করে নম্বর প্রদান করবেন। শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য নিচের গুণাবলি/সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে:
*শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পাঠসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করে;
*শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর প্রদানে আগ্রহী হয়;
*শিক্ষকের নির্দেশনা অনুসারে শ্রেণিকাজ শুরু ও সম্পন্ন করে;
*শিক্ষকের নির্দেশনামতো একক/জোড়ায়/দলগত কাজে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করে;
*পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে;
*বাড়ির কাজ দেওয়া হলে তা যথাসময়ে সম্পন্ন করে;
*ভূমিকাভিনয় (রোল-প্লে)/প্রেজেন্টেশন/প্রজেক্ট ওয়ার্ক ইত্যাদি কাজে অংশগ্রহণ করে ও সম্পন্ন করে;
শিক্ষক উল্লিখিত বিষয়সমূহ সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন এবং প্রতি প্রান্তিকে একবার নম্বর প্রদান করবেন। কোনো শিক্ষার্থী কম সক্রিয় থাকলে তার সাথে আন্তরিকভাবে কথা বলে নিষ্ক্রিয়তার কারণ বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
ক.৩ ভাষাদক্ষতা/বোধগম্যতা
অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকের নির্দিষ্ট কিছু অংশ পড়েই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে থাকে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের পাঠ্যবিষয়ের বোধগম্যতা ও ভাষাদক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন হয় না। এ কারণে সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত বোধগম্যতা ও ভাষা দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনুসৃত পদ্ধতিতে মূল্যায়ন সম্পন্ন করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদেরকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার ৪টি দক্ষতার (শোনা, বলা, পড়া ও লেখা) সবগুলোই অনুশীলন করাতে হবে। গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্মশিক্ষা, শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা এসকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থীর ভাষা দক্ষতা এবং বোধগম্যতার উন্নয়ন/পর্যায় পর্যবেক্ষণ করে নোট নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ফলাবর্তন দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভাষাদক্ষতা/বোধগম্যতা কীভাবে মূল্যায়ন করতে হবে তা বিষয়ভিত্তিক পরিশিষ্ট অংশে আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষক ভাষাদক্ষতা/বোধগম্যতার ধারণাকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং প্রতি প্রান্তিকে একবার নম্বর প্রদান করবেন।
ক.৪ ক্লাস টেস্ট
পাঠ্যপুস্তক আছে এমন বিষয়সমুহের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রতি প্রান্তিকে ঐ প্রান্তিকের জন্য নির্ধারিত অর্জনোপযোগী যোগ্যতা ও শিখনফলের আলোকে কমপক্ষে দুটি ক্লাস টেস্ট নেবেন। শুধুমাত্র শিক্ষক সহায়িকার মাধ্যমে পাঠদান করা হয় এমন বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে কমপক্ষে একটি ক্লাস টেস্ট নেয়া যেতে পারে। লিখিত, মৌখিক, ব্যবহারিক কাজ অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সের সমন্বয়ে ক্লাস টেস্ট নেবেন। একাধিক ক্লাস টেস্ট নেয়ার ক্ষেত্রে গড় নম্বর বিবেচনা করতে হবে। শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালে ক্লাস টেস্ট নিতে হবে এবং ফলাফল পর্যালোচনা করে শিক্ষক প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ফলাবর্তন প্রদান করতে হবে।
খ. সামষ্টিক মূল্যায়ন কার্যক্রম
পাঠ্যপুস্তক আছে এমন বিষয়সমুহের ক্ষেত্রে প্রতি প্রান্তিক শেষে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ নম্বরের এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০ নম্বরের সামষ্টিক মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হবে। সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা অনুসারে একটি প্রান্তিকে যতটি অধ্যায়/পাঠ সম্পন্ন হবে, তার ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও রুটিন প্রণয়ন করে সামষ্টিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক সামষ্টিক মূল্যায়নের প্রশ্নকাঠামো ও নম্বর বণ্টন পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
খ.১ লিখিত পরীক্ষা
সামষ্টিক মূল্যায়নে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিষয়ভিত্তিক লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে উত্তর প্রদানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। উত্তরপত্র মূল্যায়ন, তথ্য সংরক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনপূর্বক শিক্ষক প্রমাণক হিসেবে তা সংরক্ষণ করবেন। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সামষ্টিক মূল্যায়নে লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্যই জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর
দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্নের সমন্বয় থাকতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত অনুশীলনীর পাশাপাশি প্রশ্নপত্রে শিখনফল অনুসারে নতুন প্রশ্ন সন্নিবেশিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। বিভিন্ন বিষয়ের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নকাঠামো বিষয়ভিত্তিক অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষক প্রয়োজনবোধে প্রশ্নকাঠামোতে যৌক্তিক পরিবর্তন করতে পারবেন।
২.১ শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়নের শতকরা হার
·
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি:
1.
ধারাবাহিক মূল্যায়ন – ৫০% (নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম)
2.
সামষ্টিক মূল্যায়ন – ৫০% (প্রতি প্রান্তিকে)
·
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি:
3.
ধারাবাহিক মূল্যায়ন – ৩০% (নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম)
4.
সামষ্টিক মূল্যায়ন – ৭০% (প্রতি প্রান্তিকে)
·
শিক্ষক সহায়িকা নির্ভর বিষয় (প্রথম-পঞ্চম):
5.
ধারাবাহিক মূল্যায়ন – ১০০% (চলাকালীন)
২.২ বিষয়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন
প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি
|
বিষয় |
ধারাবাহিক নম্বর |
সামষ্টিক নম্বর |
মোট |
|
বাংলা |
৫০ |
৫০ |
১০০ |
|
ইংরেজি |
৫০ |
৫০ |
১০০ |
|
গণিত |
৫০ |
৫০ |
১০০ |
|
সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান (সমন্বিত) |
৫০ |
- |
৫০ |
|
ধর্মশিক্ষা |
৫০ |
- |
৫০ |
|
শিল্পকলা |
৫০ |
- |
৫০ |
|
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা |
৫০ |
- |
৫০ |
সর্বমোট: ৬০০
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি
|
বিষয় |
ধারাবাহিক নম্বর |
সামষ্টিক নম্বর |
মোট |
|
বাংলা |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
ইংরেজি |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
গণিত |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
বিজ্ঞান |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
ধর্মশিক্ষা |
৩০ |
৭০ |
১০০ |
|
শিল্পকলা |
৫০ |
- |
৫০ |
|
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা |
৫০ |
- |
৫০ |
সর্বমোট: ৭০০
৩. পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণের শর্তাবলি
পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে শিক্ষার্থীকে নিম্নবর্ণিত শর্ত পূরণ করতে হবে:
শিক্ষার্থীকে প্রতি প্রান্তিকে মোট কার্যদিবসের ন্যূনতম ৮৫% শ্রেণিতে উপস্থিত থাকতে হবে;
শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক পাশ নম্বর ৪০%। তবে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পাশ নম্বর ৩৩%;
পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে তিন প্রান্তিকে মোট নম্বরের গড় ৪০% নম্বর পেতে হবে;
প্রতি প্রান্তিকের সামষ্টিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীকে উপস্থিত থাকতে হবে। তবে, অসুস্থতাজনিত/অনিবার্য কারণে কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারলে শিক্ষার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন প্রশ্নপত্রে বিকল্প পরীক্ষা গ্রহণ করবেন।
৪. ফলাফল ও শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি
ফলাফল ও শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরিতে নিম্নবর্ণিত কাজ করতে হবে:
৪.১ মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ;
৪.২ শিখন অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি;
উপর্যুক্ত কাজ দুটি নিচে ধাপে ধাপে বর্ণিত হলো।
৪.১ মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ ছক
মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের জন্য ছক 'ক', ৫০ নম্বরের জন্য ছক 'খ' নমুনা হিসেবে প্রদান করা হলো। শিক্ষক নমুনা ছকের আলোকে শ্রেণিভিত্তিক/বিষয়ভিত্তিক রেজিস্টার তৈরি করে মূল্যায়নের তথ্য সংরক্ষণ করবেন।
৪.২ শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি
শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন ও গ্রেড নির্ধারণ পদ্ধতি
● প্রতি প্রান্তিকে প্রতিটি বিষয়ে একজন শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে প্রাপ্ত নম্বরের সমষ্টি করে মোট নম্বর হিসাব করতে হবে এবং শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদান করতে হবে।
● ৩য় প্রান্তিক শেষে তিন প্রান্তিকের বিষয়ভিত্তিক গড় নম্বর এবং পাশের ছক অনুযায়ী গ্রেড প্রদান করতে হবে।
● শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুতের জন্য তিন প্রান্তিকের প্রাপ্ত মোট নম্বরের সমষ্টিকে সর্বোচ্চ নম্বরের সাথে শতকরা হিসেবে তুলনা করে পাশের ছক অনুযায়ী গ্রেড প্রদান করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, তৃতীয় শ্রেণিতে প্রতি প্রান্তিকে ৭০০ নম্বরের মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। ধরা যাক, তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী—
-
১ম প্রান্তিকে মোট পেয়েছে: ৫২০ নম্বর
-
২য় প্রান্তিকে মোট পেয়েছে: ৬৮০ নম্বর
-
৩য় প্রান্তিকে মোট পেয়েছে: ৬১০ নম্বর
তিন প্রান্তিকে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত মোট নম্বরের গড় =
(৫২০ + ৬৮০ + ৬১০) ÷ ৩ = ৬০৩.৩৩ (প্রায়)
শতকরা গড় নম্বর =
(৬০৩.৩৩ ÷ ৭০০) × ১০০ = ৮৬.১৯% (প্রায়)
সুতরাং, তার সামষ্টিক গ্রেড হবে: A (অতি উত্তম)
গ্রেড নির্ধারণের ছক
| প্রাপ্ত নম্বর (শতকরা) | গ্রেড | শিক্ষণ অর্জন |
|---|---|---|
| ৮০% - ১০০% | A | অতি উত্তম |
| ৬০% - ৭৯% | B | উত্তম |
| ৪০% - ৫৯% | C | সন্তোষজনক |
| ০% - ৩৯% | D | সহযোগিতা প্রয়োজন |
অন্যান্য নির্দেশনা
● অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রতি প্রান্তিকে মোট কার্যদিবস এবং শিক্ষার্থীর উপস্থিতি উল্লেখ করতে হবে।
● ব্যক্তিগত ও সামাজিক গুণাবলির অংশে শিক্ষার্থীদের ‘সততা’, ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘আচরণ’ পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষক তাদের অবস্থান ‘ক’, ‘খ’ বা ‘গ’ উল্লেখ করবেন।
শিক্ষার্থীদের ‘সততা’, ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘আচরণ’ উন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রয়োজনীয় উৎসাহ ও পরামর্শ প্রদান করবেন।
● প্রতি প্রান্তিকে শিক্ষার্থীর শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদন/রিপোর্ট কার্ড অভিভাবককে অবহিত করে স্বাক্ষর নিয়ে শ্রেণি শিক্ষক সংরক্ষণ করবেন।
অভিভাবক সমাবেশে শিক্ষার্থীর শিক্ষণ অগ্রগতি সম্পর্কে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করতে হবে।
শ্রেণিশিক্ষক ৩য় প্রান্তিকে শিক্ষার্থীর শিক্ষণ অগ্রগতি প্রতিবেদনের একটি কপি অভিভাবককে হস্তান্তর করবেন।


No comments
Your opinion here...