সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল ডেকোরাম ও শিষ্টাচার
সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল ডেকোরাম ও শিষ্টাচার
(একজন দায়িত্বশীল অফিসারের নীরব পরিচয়)
একজন সরকারি কর্মকর্তা কেবল তার পদ, ক্ষমতা বা স্বাক্ষরের মাধ্যমে পরিচিত হন না—
বরং তার আচরণ, শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও ব্যক্তিত্বই প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের অভাব কিংবা ব্যক্তিগত অহমিকার কারণে অফিসিয়াল ডেকোরাম মানা হয় না। অথচ এসব শিষ্টাচার একজন অফিসারের পেশাগত মর্যাদা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি দুটোই তুলে ধরে।
সরকারি কর্মকমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক স্যার সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
১️) অনুষ্ঠানে স্পাউসের সম্মান
যেকোনো অফিসিয়াল অনুষ্ঠানে অফিসারের স্পাউস (স্বামী/স্ত্রী) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবেন।
তাকে রিসিভ করা, সম্ভব হলে প্রথম সারিতে বসানো এবং উপযুক্ত সম্মান দেখানো একজন অফিসারের দায়িত্ব।
২️) হ্যান্ডশেকের শিষ্টাচার
সিনিয়র আগে হাত বাড়াবেন, এরপর জুনিয়র
দুজনই দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে, হালকা চাপ দিয়ে হ্যান্ডশেক
লেডি অফিসারের ক্ষেত্রে কখনো আগ বাড়িয়ে হাত বাড়ানো যাবে না
৩️) বসার ভদ্রতা
একজন অফিসার কখনো অন্য অফিসারকে দাঁড়িয়ে রাখবেন না।
যদি সিনিয়র নিজে বসতে না বলেন, জুনিয়র ভদ্রভাবে বলতে পারেন—
“স্যার, বসতে পারি?” বলে নিজেই বসে পড়া ভদ্রতার অংশ।
৪️) অফিসিয়াল গাড়ির শিষ্টাচার
অফিসার কখনোই গাড়ির একদম পেছনের সিটে বসবেন না
মাঝের সিটে বসতে হবে
ড্রাইভারের পাশের সামনের সিটেও বসা অনুচিত
জায়গা না থাকলে অন্য ব্যবস্থা নেওয়াই শ্রেয়
৫️) পোশাক ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
সবসময় ওয়েল ড্রেসড থাকতে হবে
দাড়ি থাকলে পরিপাটি, না থাকলে ক্লিন শেভড
চুল এলোমেলো নয়, পকেটে চিরুনি থাকা উত্তম
ডাক্তারদের ক্ষেত্রে রোগী দেখার সময়ও ফরমাল ড্রেস বজায় রাখা জরুরি
৬️) খাবার টেবিল ম্যানারস
কাঁটা-চামচে খেতে পারলে শব্দ ছাড়া খেতে হবে
না পারলে পরিষ্কারভাবে হাত দিয়ে
আধা হাত, আধা চামচ—এভাবে খাওয়া যাবে না
চামচের টুংটাং শব্দ অশোভন
৭️) বুফে ও ফরমাল ডাইনিং আচরণ
নিজের প্লেট নিয়ে বুফেতে যাওয়া যাবে না
নির্ধারিত বুফে প্লেট ব্যবহার করতে হবে
একবার খাবার নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার নিজে যাওয়া অনুচিত
ন্যাপকিন উরুর উপর থাকবে
গরম খাবার ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করা যাবে না
টেবিলে রাজনীতি, ধর্ম বা অফিসিয়াল আলোচনা নিষিদ্ধ
৮️) ফরমাল লাঞ্চ ও ডিনার
চিফ গেস্ট খাওয়া শুরু করলে তবেই অন্যরা শুরু করবেন
চিফ গেস্ট শেষ করলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে
দাওয়াত শেষে হোস্ট বা ভাবীকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হবে
৯️) ফোনে কথা বলার শিষ্টাচার
কারো কাছে ফোন করলে আগে নিজের পরিচয় দিতে হবে—
এটি ভদ্রতা ও পেশাদারিত্বের অংশ।
১০) বক্তব্য দেওয়ার নৈতিকতা
বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে
অস্পষ্ট, অশালীন বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য একজন অফিসারের জন্য অনুচিত
১️১) স্টেজ ম্যানারস
আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে
সোজা ও রিল্যাক্সড ভঙ্গি
চোখের যোগাযোগ, হাতের ভঙ্গি ও কণ্ঠের ওঠানামা গুরুত্বপূর্ণ
১️২) পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও যাওয়া নয়
কোনো অফিসার অন্য অফিসারের বাসা বা অফিসে হুটহাট যাবেন না
আগেই জানাতে হবে
সিনিয়রের বাসায় শিশুদের না নেওয়াই উত্তম
১️৩) জনসম্মুখে শাসন নয়
কোনো সহকর্মী বা স্টাফকে প্রকাশ্যে বকা বা অপমান করা যাবে না।
সমস্যা থাকলে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করতে হবে।
১️৪) বসের সাথে সীমারেখা
বস যতই ফ্রেন্ডলি হোন, জুনিয়র অফিসারকে অফিসিয়াল সীমারেখা বজায় রাখতে হবে।
১️৫) সিনিয়রের আগমনে সম্মান
সিনিয়রের রুমে বসে থাকাকালীন অন্য কোনো সিনিয়র এলে প্রয়োজনে চেয়ার ছেড়ে তাকে বসতে বলতে হবে।
১️৬) ফোন কেটে দেওয়ার শিষ্টাচার
সিনিয়র ফোন করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইন কাটা যাবে না।
✍️ শেষ কথা
এই শিষ্টাচারগুলো কোনো বইয়ের নিয়ম নয়, এগুলো একজন অফিসারের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও রাষ্ট্রীয় শালীনতার প্রতিচ্ছবি।
প্রশিক্ষণের অভাব বা অহংকারের কারণে যারা এগুলো মানেন না—তারা নিজের অজান্তেই নিজের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করেন।
👉 একজন ভালো অফিসার হতে হলে আগে ভালো মানুষ ও ভদ্র নাগরিক হওয়া জরুরি।



No comments
Your opinion here...