প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কারে কনসালটেশন কমিটির রিপোর্ট।
👉 প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তনের সুপারিশ: এক শিফট স্কুল, ১০ম গ্রেডে প্রধান শিক্ষক, নতুন কাঠামোয় শিক্ষক পদোন্নতি
উপশিরোনাম:
শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিশুর কল্যাণ ও শিক্ষক মর্যাদা নিশ্চিত করতে ৮টি খাতে শতাধিক সুপারিশ—শিখন সময় বৃদ্ধি, মিড-ডে-মিল, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দুর্নীতি দমনেও গুরুত্ব
সংবাদ প্রতিবেদন:
প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা খাতে ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ‘প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার পরামর্শক কমিটি’ তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিটি দেশের ১১টি জেলার ১২টি উপজেলার মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শন, অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ৮টি মূল বিষয়ে শতাধিক সুপারিশ করেছে।
এই সুপারিশগুলোকে আশু, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় হিসেবে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
১️⃣ শিখনমানের স্থবিরতা দূর করা,
২️⃣ এবং শিশুর শিখন, কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা।
🔹 চিহ্নিত ৮টি প্রধান খাত
১. শিক্ষণ-শিখন ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন
২. শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী
৩. অভিগম্যতা, অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্য নিরসন
৪. প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও শিশুর বিকাশ
৫. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও বিদ্যালয়-বহির্ভূত শিশু
৬. শিক্ষা শাসন ও ব্যবস্থাপনা
৭. ক্রস-কাটিং (বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) বিষয়
৮. সংস্কার বাস্তবায়ন, অর্থায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপ
🏫 গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ
১. ভিত্তিমূলক দক্ষতা জোরদার:
বাংলা ও গণিতকে প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৬০–৭৫ মিনিট এই দুই বিষয়ে শিক্ষণ সময় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
২. এক শিফটের স্কুল:
শিখন সময় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল বিদ্যালয়কে এক শিফটের আওতায় আনতে হবে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে (PEDP5) ৫০% বিদ্যালয়ে এবং আগামী ১০ বছরের মধ্যে সকল বিদ্যালয়ে এক শিফট চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
৩. নিরাময়মূলক সহায়তা:
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তায় স্থানীয়ভাবে প্যারা-টিচার নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে কোনো শিশু শিখনে পিছিয়ে না পড়ে।
৪. শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় মূল্যায়ন পদ্ধতি:
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার পরিবর্তে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (NSA)-এর আদলে বিদ্যালয়ভিত্তিক দক্ষতা জরিপের মাধ্যমে সবুজ-হলুদ-লাল মানচিহ্ন নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৫. দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সহায়তা:
দ্রুত সময়ে মিড-ডে-মিল, খাতা-কলম-ব্যাগ বিতরণ, এবং অতি দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
👩🏫 শিক্ষক মর্যাদা ও বেতন কাঠামো
শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও উন্নয়ন নিয়ে কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে।
বর্তমানে শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে এবং প্রধান শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে আছেন।
আদালতের রায়ে প্রধান শিক্ষকের ১০ম গ্রেড নির্ধারণে সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও সরকার রিভিউ আবেদন করেছে।
কমিটি সরকারের রিভিউ আবেদন প্রত্যাহারের পরামর্শ দিয়ে প্রধান শিক্ষকের জন্য ১০ম গ্রেড এবং পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ চালুর সুপারিশ করেছে।
সহকারী শিক্ষক’ পদবি বিলুপ্ত করে শিক্ষক হিসেবে যোগদান, ২ বছর পর স্থায়ীকরণ এবং পরবর্তী ২ বছর পর ‘সিনিয়র শিক্ষক’ পদে পদোন্নতির প্রস্তাব করা হয়েছে (১১তম গ্রেডে)।
ভবিষ্যতে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের জন্য স্বতন্ত্র মর্যাদা ও উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রণয়নেরও প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পদোন্নতিযোগ্য পদ বৃদ্ধি, শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, আঞ্চলিক অফিস স্থাপন ও প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
🚨 দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রায়ন
দুর্নীতি ও অসদাচরণ প্রতিরোধে একটি জাতীয় হটলাইন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাপ্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
বিকেন্দ্রায়নের লক্ষ্যে দেশের ১০ জেলায় ২০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা বাড়ানো যায়।
🧒 প্রাক-প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা
৫+ বয়সের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ৪+ বয়সীদের জন্য পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বিস্তারের কথা বলা হয়েছে।
বিদ্যালয়-বহির্ভূত শিশুদের পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর নেতৃত্বে এনজিওদের সঙ্গে অংশীদারিত্বে নতুন মডেল প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধী, শ্রমজীবী, নৃগোষ্ঠী ও জলবায়ুপ্রভাবিত শিশুদের জন্য বিশেষ উদ্যোগেরও কথা বলা হয়েছে।
🎓 শিক্ষা কমিশন ও পরামর্শক পরিষদ
স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারকে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য একটি শিক্ষা পরামর্শক পরিষদ (Education Consultative Council) গঠনের প্রস্তাবও প্রতিবেদনে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে স্থায়ী কমিশনে রূপ নিতে পারে।
🔰 উপসংহার
কমিটি জানিয়েছে, শিক্ষা সংস্কারে কোনো “জাদু সমাধান” নেই। তবে সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত, সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা ও বাজেট সহায়তা পেলে এই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব।
পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রম (PEDP5) ও সরকারের বার্ষিক বাজেট হবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম।
ড. মনজুর আহমদ
আহ্বায়ক, প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার পরামর্শক কমিটি
প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫




No comments
Your opinion here...